কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলার কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী মজিবর রহমানের তথ্য সঠিকভাবে যাচাই না করে অনৈতিক লেনদেনে ৭ বছর বয়স কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসারের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত সুপার ও আরও কয়েকজন ব্যক্তি এ অনিয়মের সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া চাকরি সংক্রান্ত জটিলতা থাকা সত্ত্বেও উক্ত কর্মচারীর বেতন প্রদান করেন ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল ইসলাম ও উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলম।

এদিকে সুপার সাঈদুর রহমানের সাময়িক বরখাস্ত প্রত্যাহার হলেও ভারপ্রাপ্ত সুপার দায়িত্ব ছাড়ছেন না, অনিয়মের অভিযোগ ছয় মাস থেকে সকল শিক্ষক-কর্মচারীর বেতন বন্ধ থাকার বিষয়টি বিভিন্ন জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন নিউজ পোর্টালে একাধিকবার প্রকাশিত হয়েছে।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মজিবর রহমান ২০০০ সালে অষ্টম শ্রেণি পাসের প্রশংসাপত্র দেখিয়ে কামাত আঙ্গারিয়া দাখিল মাদ্রাসায় চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী হিসেবে নিয়োগ পান এবং ২০০১ সালে এমপিওভুক্ত হন। তার প্রশংসাপত্রে জন্মতারিখ ৩ নভেম্বর ১৯৬২ এবং জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর ১৯৬২৪৯১০৬১৯৪০৭৭৯৭-এও একই জন্মতারিখ লিপিবদ্ধ। সে হিসেবে ২ নভেম্বর ২০২২ সালে তার চাকরির বয়সসীমা শেষ হওয়ার কথা।

কিন্তু এমপিওভুক্তির সময় ভুলভাবে তার জন্মতারিখ ১ মার্চ ১৯৬৯ লিপিবদ্ধ হয়। বয়সের এই গরমিল সংশোধনের জন্য তৎকালীন সুপার সাঈদুর রহমান ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির পক্ষ থেকে মজিবর রহমানকে একাধিকবার লিখিতভাবে অবহিত করা হয়। প্রশংসাপত্র ও জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী এমপিও শিটের বয়স সংশোধন না করায় ২০২৩ সালে তার বেতন বন্ধ করে এমপিও শিট থেকে নাম কর্তনের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়।

বেতন স্থগিতের পর মজিবর রহমান অবসরে না গিয়ে উল্টো প্রতিষ্ঠান প্রধান ও পরিচালনা কমিটির বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। একই সময়ে মজিবরসহ ঐ প্রতিষ্ঠানের ৫ জনের বিরুদ্ধে জালিয়াতির অভিযোগে উক্ত মাদ্রাসার সহ-মৌলভী মোস্তাফিজুর রহমান মামলা করেন, যা বর্তমানে চলমান রয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সুপার সাঈদুর রহমানকে চক্রান্তমূলকভাবে গ্রেপ্তার ও সাময়িক বরখাস্ত করা হলে ভারপ্রাপ্ত সুপার হিসেবে দায়িত্ব পান সহ-মৌলভী আমিনুল ইসলাম। আমিনুল সহ-সুপার পদে নিয়োগ নিয়ে কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে সহ-মৌলভী হিসেবে এমপিওভুক্ত হয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। দায়িত্ব গ্রহণের পর তিনি একক ক্ষমতাবলে মজিবর রহমানের বয়স সংশোধনের প্রত্যয়ন দেন। জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন হওয়ার পর আদালতের কোনো আদেশ ছাড়াই প্রায় তিন বছরের স্থগিত বেতন উত্তোলনের ব্যবস্থা করেন।

এছাড়া অভিযোগ রয়েছে, তিনি বার্ষিক/২৫ পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ না করেই বই বিতরণ করেছেন। এসব কাজে তার সহযোগী হিসেবে উক্ত প্রতিষ্ঠানের সফিয়ার, মজিবর রহমান, ইমরুল রাসেল এবং তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন ও সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জড়িত রয়েছেন।

এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালের জুন মাসে কুড়িগ্রাম জেলা নির্বাচন অফিসার আলমগীর হোসেন কোনো তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করেই মজিবর রহমানের জন্মতারিখ ৩ নভেম্বর ১৯৬২ থেকে পরিবর্তন করে ১ মার্চ ১৯৬৯ করেন। এর ফলে চাকরির বয়সসীমা অতিক্রম করার পরও প্রায় তিন বছরের স্থগিত বেতন উত্তোলনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। অথচ মজিবর রহমানের চাকরি ও বয়স সংক্রান্ত একাধিক মামলা বর্তমানে আদালতে চলমান রয়েছে।

অনুসন্ধানে মজিবর রহমানের দুটি পৃথক অষ্টম শ্রেণির প্রশংসাপত্র পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে প্রশংসাপত্র প্রদানকারী সাবেক সুপার আব্দুল জলিল জানান, জন্মসাল ১৯৬২ উল্লেখ করা প্রশংসাপত্রটি তার নিজের হাতের লেখা। তবে ১৯৬৯ সালের জন্মসাল উল্লেখ করা কম্পিউটার সিলযুক্ত প্রশংসাপত্রটি তার লেখা নয় এবং সে সময় কোনো কম্পিউটার সিল ব্যবহারের প্রচলন ছিল না জানান।

আরও অনুসন্ধানে দেখা যায়, যদি মজিবর রহমানের জন্ম ১৯৬৯ সাল হয়, তিনি ১৯৮১ সালে অষ্টম শ্রেণি পাস করায় তার বয়স দাঁড়ায় মাত্র ১২ বছর, যা শিক্ষা বিধি ও বাস্তবতার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। একই সঙ্গে তার ভাইবোনদের বয়সের সঙ্গেও বড় ধরনের অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়।

অভিযোগ রয়েছে, মজিবর রহমান আদৌ অষ্টম শ্রেণি পাস করেননি এবং ভুয়া সনদের মাধ্যমে চাকরি গ্রহণ করেছেন। তার শিক্ষাজীবনের সহপাঠীদের নাম জানতে চাইলে তিনি বন্ধু দিয়ে কি হবে, প্রশংসাপত্র প্রদানকারী সুপার জীবিত আছেন।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত সুপার আমিনুল দাবি করেন, মজিবরের দাখিলকৃত কাগজপত্র যাচাই করেই বয়স সংশোধনের প্রত্যয়ন দেওয়া হয়েছে এবং আদালতের রায়ের ভিত্তিতেই বেতন প্রদান করা হয়েছে।

অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের সফিয়ার, মজিবর রহমান, ইমরুল রাসেল এবং তিলাই উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমজাদ হোসেন ও সহকারী শিক্ষক রফিকুল ইসলাম জানায় ইতিপূর্বে সুপার সাঈদুর রহমানের অনিয়মের বিষয়ে অনেক নিউজ হয়েছে।

এডহক কমিটির সভাপতি মাহফুজার রহমান বলেন, পরিচালনা কমিটিকে অবহিত না করে এবং কোনো রেজুলেশন ছাড়াই মজিবর রহমানের বয়স সংশোধন ও বেতন সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা স্পষ্টতই বিধিবহির্ভূত। এছাড়া বরখাস্ত প্রত্যাহার করা হলেও ভারপ্রাপ্ত সুপার দায়িত্ব ছাড়ছে না।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার জাহাঙ্গীর আলমের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, বয়স ও মামলা সংক্রান্ত জটিলতা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও তিনি বেতন বিলের প্রতিসাক্ষরের মাধ্যমে স্থগিত বেতন প্রদানে পরোক্ষ সহায়তা করেছেন এবং ভারপ্রাপ্ত সুপারের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি প্রথমে কিছু জানেন না বলে দাবি করেন, তবে পরবর্তীতে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী তিনটি বিষয়ে প্রতিবেদন দিয়েছেন বলে স্বীকার করেন, যদিও সেসব বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি।

জেলা নির্বাচন অফিসার আলমগীর হোসেন বলেন, মজিবর রহমানের এমপিও কপি, প্রশংসাপত্র, জন্ম নিবন্ধন ও ভারপ্রাপ্ত সুপারের প্রত্যয়ন পাওয়ার পর জন্মতারিখ সংশোধন করা হয়েছে। তার বেতন বন্ধ বা আদালতে মামলা চলমান রয়েছে—এ তথ্য তিনি জানতেন না। তিনি আরও বলেন, আদালতের রায়ে চাকরি শেষ হলে জাতীয় পরিচয়পত্রটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হবে। তবে অনৈতিক লেনদেনের বিষয়ে কোনো প্রমাণ নেই বলেও দাবি করেন।

জেলা শিক্ষা অফিসার মোঃ শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকাশিত প্রতিবেদন ও তথ্য দেখেছি। নির্বাচন কমিশনের বিষয়ে তারা দেখবেন আর প্রতিষ্ঠান বিষয়ে তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

রংপুর আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তা সম্ভব হয়নি। পরে অতিরিক্ত আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, বিষয়টি না দেখে কিছু বলা সম্ভব নয়। তথ্যসহ সচিব বা আঞ্চলিক নির্বাচন অফিসে লিখিত বা হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগ দেওয়া হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও তিনি জানান।

অনেক নাগরিকের জাতীয় পরিচয়পত্রে নামের বানান, তথ্যসহ একাধিক ভূল রয়েছে। সংশোধন করতে গিয়ে অনেক হয়রানির শিকারের অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি রয়েছে।

স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, অতীতে সুপার সাঈদুর রহমান দোষ করে থাকলেও বর্তমানে দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে অনিয়ম ও জালিয়াতির মাধ্যমে একজন কর্মচারীর বয়স ৭ বছর কমিয়ে অবৈধভাবে বেতন উত্তোলনের সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। তারা মজিবর রহমানের নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বয়স সংশোধন ও বেতন প্রদানের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

You missed