আমদানিকারকের নিজস্ব স্টোরেজ সুবিধা না থাকায় তারা লাইটারেজ জাহাজকে অস্থায়ী ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন।
লাইটারেজ সংকটে ডেমারেজে গুনতে হচ্ছে লাখ লাখ ডলার
চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদারভেসেলের (বড় জাহাজ) জট তৈরি হয়েছে। আমদানিপণ্য খালাসে প্রয়োজনীয় লাইটারেজ (ছোট খালাসি জাহাজ) সংকটকে এ অবস্থার জন্য দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা। বর্তমানে সহস্রাধিক লাইটারেজ জাহাজ পণ্য নিয়ে দেশের বিভিন্ন নৌঘাটে ভাসমান গুদাম হিসেবে অবস্থান করায় নতুন করে পণ্য খালাস ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে বন্দরের কার্যক্রমে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার পাশাপাশি প্রতিদিন লাখ লাখ ডলার ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে আমদানিকারকদের। পণ্য নিয়ে সহস্রাধিক লাইটারেজ পানিতে ভাসমান থাকায় আমদানিপণ্য খালাস বিলম্বিত হচ্ছে। যার মধ্যে কিছু রোজায় ব্যবহৃত পণ্যও আছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, অনেক আমদানিকারকের নিজস্ব স্টোরেজ সুবিধা না থাকায় তারা লাইটারেজ জাহাজকে অস্থায়ী গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন। এসব লাইটারেজ থেকে সরাসরি বাজারে পণ্য সরবরাহ করায় জাহাজ খালাসে দীর্ঘ সময় লাগছে। এতে একদিকে নৌপথে পণ্য পরিবহনে সংকট তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে বন্দরে মাদারভেসেলের গড় অবস্থানকাল বেড়ে যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত বন্দরের জেটি ও বহির্নোঙরে মোট ১৪৬টি মাদারভেসেল অবস্থান করছে। গত বছর একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৯৯টি। বর্তমানে বন্দরে অবস্থানরত জাহাজগুলোর মধ্যে রয়েছে—
স্ক্র্যাপ ও পাথরসহ জেনারেল কার্গো: ৫৩টি, গম ও ভুট্টা: ২৫টি, সিমেন্ট ক্লিংকার: ২০টি, সার: ৭টি, চিনি: ৫টি, লবণ: ২টি।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে নিবন্ধিত পণ্যবাহী লাইটারেজ রয়েছে ৩ হাজার ৮৫৮টি। এর মধ্যে এক হাজারের বেশি নিয়ন্ত্রণ করে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট কো-অর্ডিনেশন সেল (ডব্লিউটিসিসি)। বাকিগুলো বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর মালিকানাধীন, যেমন—মেঘনা, সিটি, বসুন্ধরা, আবুল খায়ের, আকিজ ও টিকে গ্রুপ।
ডব্লিউটিসিসি জানায়, বর্তমানে দেশের ৭৪টি ঘাটে ৬৩০টি লাইটারেজ পণ্য খালাসের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে ১৩৪টি জাহাজ ১৫ দিনের বেশি সময় ধরে অপেক্ষমাণ।
ডব্লিউটিসিসির তথ্য অনুযায়ী— ‘এমভি আনিসা জান্নাত-১’ ৪৭ দিন ধরে আশুগঞ্জে টিএসপি সার নিয়ে অবস্থান করছে, ‘এমভি শুভরাজ-৮’ ৪৬ দিন ধরে হাসনাবাদে গম নিয়ে অপেক্ষমাণ, ‘এমভি ফজলুল হক-৭’ ৩৭ দিন ধরে নিতাইগঞ্জে ভুট্টা নিয়ে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক শফিউল আলম জানান, বর্তমানে প্রায় ১১৪টি মাদারভেসেল বন্দরে অবস্থান করছে, যার মধ্যে ৯০টি খাদ্যপণ্যবাহী। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে খালাস সম্ভব না হওয়ায় প্রতিটি জাহাজকে দৈনিক ১০ থেকে ২৫ হাজার ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ দিতে হচ্ছে।
কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) চট্টগ্রাম বিভাগের সভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বড় আমদানিকারকরা লাইটারেজকে ভাসমান গুদাম বানিয়ে বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। এতে পণ্যের দাম বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
নৌপরিবহন অধিদপ্তরের মুখ্য পরিদর্শক মো. শফিকুর রহমান জানান, লাইটারেজ দ্রুত খালাসের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিআইডব্লিউটিসি, কোস্টগার্ড ও নৌ-পুলিশের সহায়তায় মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে এবং জরিমানাও আদায় করা হয়েছে। রমজান পর্যন্ত এ অভিযান অব্যাহত থাকবে।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সংকট নিরসনে নৌপরিবহন অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।