
৩৬২ বছরের প্রাচীন হাটিকুমরুলবাংলাদেশে আবিষ্কৃত প্রাচীন স্থাপত্যশৈলীর অন্যতম অনন্য নিদর্শন সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দির। প্রায় ৩৬২ বছরের পুরোনো এই ঐতিহাসিক কীর্তিটি দেশের অভ্যন্তরে সন্ধান মেলা নবরত্ন মন্দিরগুলোর মধ্যে সর্ববৃহৎ। পোড়ামাটির সুনিপুণ কারুকার্য আর অনন্য নির্মাণশৈলী নিয়ে আজও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রাচীন স্থাপনাটি।
সিরাজগঞ্জ জেলার উল্লাপাড়া উপজেলার হাটিকুমরুল গ্রামে অবস্থিত এই মন্দিরটি প্রত্নতত্ত্ব প্রেমী এবং পর্যটকদের জন্য এক অন্যতম আকর্ষণ। ইতিহাসবিদদের মতে, সপ্তদশ শতাব্দীতে তৎকালীন স্থানীয় জমিদার রামনাথ ভাদুরী এই ঐতিহাসিক মন্দিরটি নির্মাণ করেন।
তিন স্তর ও নয় রত্নের অনন্য স্থাপত্যশৈলী
স্থাপত্যশৈলীর দিক থেকে এই মন্দিরটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন এবং জটিল নকশায় তৈরি। তিন তলা বিশিষ্ট এই বর্গাকৃতির মন্দিরের ওপর একসময় নয়টি চূড়া বা ‘রত্ন’ ছিল, যার কারণেই একে ‘নবরত্ন মন্দির’ বলা হয়।
- প্রথম স্তর: মন্দিরের নিচতলার চারপাশ জুড়েই রয়েছে চমৎকার বারান্দা, যা বেশ কয়েকটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ দ্বারা সুশোভিত।
- দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর: ওপরের দিকে ক্রমান্বয়ে ছোট হয়ে আসা এই স্তরগুলো পুরো স্থাপনাটিকে একটি রাজকীয় অবয়ব দিয়েছে।
- পোড়ামাটির ফলক চিত্র: মন্দিরের বাইরের দেয়ালে পোড়ামাটির (টেরাকোটা) ফলক দিয়ে তৈরি দেব-দেবী, রামায়ণ-মহাভারতের বিভিন্ন পৌরাণিক কাহিনী এবং তৎকালীন সামাজিক জীবনের নানা দৃশ্য খোদাই করা রয়েছে, যা তৎকালীন শিল্পকলার উচ্চমানের পরিচয় বহন করে।
ধ্বংসের মুখ থেকে পুনরুদ্ধার
দীর্ঘদিন অবহেলা, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে মন্দিরটির ওপরের চূড়াগুলো বা রত্নসমূহ ধসে পড়েছিল এবং এর দেয়ালের মূল্যবান টেরাকোটা ফলকগুলো নষ্ট হতে বসেছিল। তবে আশার কথা হলো, বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পরবর্তীতে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটির দায়িত্ব গ্রহণ করে। সংস্কার কাজের মাধ্যমে মন্দিরটিকে তার আদি রূপ ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে এবং একে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা
বর্তমানে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ইতিহাসবিদ, গবেষক এবং সাধারণ পর্যটকরা এই বিশাল নবরত্ন মন্দিরটি দেখতে আসেন। ঐতিহাসিকদের মতে, যথাযথ প্রচার এবং অবকাঠামোগত সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা গেলে হাটিকুমরুল নবরত্ন মন্দিরটি উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। ৩৬২ বছর পেরিয়েও এই নবরত্ন মন্দিরটি আমাদের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক গৌরবময় অধ্যায় হিসেবে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
