নাইমা চৌধুরীর জীবনটা যেন ধীরে ধীরে ফুরিয়ে গেছে এক হাসপাতালের চার দেয়ালের ভেতরেই।
মোঃ মনিরুজ্জামান (মুন্না)
২০০৯ সালের ১৪ নভেম্বর, মাত্র ২৫ বছর বয়সে তাঁকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি করেছিলেন স্বজনেরা। তখন নাইমা ছিলেন সুন্দর, প্রাণবন্ত এক তরুণী। চুল ছোট করে কেটে দেওয়া হয়েছিল। শুরুতে কেবিনে ছিলেন, নিয়মিত খোঁজখবরও নেওয়া হতো। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই খোঁজ কমতে থাকে, একসময় পুরোপুরি থেমে যায়।
কেবিন ছেড়ে তাঁকে রাখা হয় ওয়ার্ডে। বছরের পর বছর অবহেলায় তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। ফরসা গায়ের রং কালচে হয়ে যায়, খাবারে অনীহা ছিল দীর্ঘদিন। হিমোগ্লোবিন কমে যেত বারবার। সিজোফ্রেনিয়ার সঙ্গে লড়াই তো চলছিলই।
হাসপাতালের কর্মী মঞ্জুয়ারা খাতুন বলেন, কখনো কখনো খেতে না চাইলে বুঝিয়ে বলতেন, না খেলে বাঁচবে কীভাবে। নাইমা শান্ত গলায় বলতেন, “একদিন তো মরেই যাব।” অনেক সময় নার্সরাই মুখে তুলে খাইয়ে দিতেন তাঁকে।
এইভাবে ১৭টি বছর কেটে যায়। কেউ তাঁকে নিতে আসেনি। কোনো উৎসব, কোনো অপেক্ষা, কোনো বাড়ি ফেরা আর হয়নি। অথচ হাসপাতালের নথিতে লেখা ছিল, তিনি শারীরিক ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল। বাড়ি ফেরার জন্য প্রস্তুত ছিলেন। তবু বন্দি জীবনই তাঁর নিয়তি হয়ে থাকে।
শেষ পর্যন্ত গত সোমবার, সেই হাসপাতালেই তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত্যুকালে বয়স ছিল ৪২ বছর। আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় তাঁর মরদেহ এখনো হাসপাতালের মর্গে রাখা আছে। যদি কোনো স্বজনের খোঁজ না মেলে, তবে নাইমা চৌধুরীকে বেওয়ারিশ হিসেবেই দাফন করা হবে।
একটি মানুষ, একটি জীবন, দীর্ঘ ১৭ বছরের নীরব অপেক্ষা। এই গল্প শুধু একজন রোগীর নয়, এটি আমাদের মানবিক দায়িত্বেরও এক কঠিন প্রশ্ন।
