
পূর্বঘোষিত জাতীয় যাত্রা উৎসব বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না থাকায় এবং এর পরিবর্তে সীমিত পরিসরে নিবন্ধন প্রক্রিয়া ও নীতিমালা কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় দেশের যাত্রাশিল্প অঙ্গনে তীব্র অসন্তোষ ও গভীর অনাস্থা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ…
উৎসব আয়োজনের প্রতিশ্রুতি উপেক্ষা করে প্রশাসনিক কাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে, যা যাত্রাশিল্পের প্রকৃত চাহিদা ও বাস্তবতাকে উপেক্ষা করার শামিল।
বিভিন্ন যাত্রাদল ও সংগঠনের এক যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, পূর্বে ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল যে নভেম্বরের শেষ অথবা ডিসেম্বর মাসে বিভাগভিত্তিক জাতীয় যাত্রা উৎসব অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তীতে রাজধানী ঢাকায় জাতীয় যাত্রা উৎসব আয়োজন করা হবে। কিন্তু বাস্তবে উৎসবের প্রস্তুতি, বাজেট বরাদ্দ, ভেন্যু নির্ধারণ কিংবা অংশগ্রহণকারী দল নির্বাচনের কোনো দৃশ্যমান কার্যক্রম না থাকলেও নিবন্ধন কার্যক্রম শুরু করার তৎপরতা দেখা গেছে। এতে শিল্পীসমাজের মধ্যে বিভ্রান্তি, ক্ষোভ ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়েছে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ২০৫টি নিবন্ধিত যাত্রাদল থাকলেও মাঠপর্যায়ে নিয়মিত মঞ্চায়ন কার্যক্রম মারাত্মকভাবে সংকুচিত। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, মৌসুমি নির্ভরতা, পৃষ্ঠপোষকতার অভাব এবং প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তার ঘাটতিতে বহু দল কার্যত স্থবির। এমন বাস্তবতায় বৃহৎ সাংস্কৃতিক উৎসবের মাধ্যমে শিল্পীদের কর্মসংস্থান ও সাংস্কৃতিক পুনরুজ্জীবনের সুযোগ তৈরি করার পরিবর্তে কেবল কাগুজে নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় জোর দেওয়া কতটা যৌক্তিক—সে প্রশ্ন এখন শিল্পীসমাজের মুখে মুখে।
“নিবন্ধিত উৎসব” ও “জাতীয় যাত্রা উৎসব”—এই দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়,
যাত্রাশিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, নিবন্ধিত উৎসব এবং জাতীয় যাত্রা উৎসব—দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন কাঠামো ও উদ্দেশ্যের আয়োজন। নিবন্ধন প্রক্রিয়ায় কোনো যাত্রাদলকে নিজস্ব অর্থায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট নিবন্ধিত হতে হয়; এতে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সরাসরি আর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয় না। অন্যদিকে, জাতীয় যাত্রা উৎসব মানেই সরকার-সমর্থিত সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে অংশগ্রহণকারী প্রতিটি যাত্রাদলকে শিল্পকলা একাডেমির পক্ষ থেকে নির্ধারিত সম্মানী ও আর্থিক অনুদান প্রদান করা হয়।
এই মৌলিক পার্থক্য সত্ত্বেও ২০২৫’সালের নিবন্ধন কার্যক্রমকে “জাতীয় যাত্রা উৎসব” হিসেবে প্রচার করা হয়েছে—এমন অভিযোগ উঠেছে একাধিক সংগঠনের পক্ষ থেকে, এবং তাঁর দৃশ্যমান প্রমাণ রয়েছেন। যাত্রাশিল্পী ও বুদ্ধিজীবী সমাজের প্রশ্ন, নিবন্ধনকে উৎসব হিসেবে উপস্থাপন করা কি ইচ্ছাকৃত বিভ্রান্তি সৃষ্টি নয়..?
এটি কি জনমনে ভুল বার্তা ছড়িয়ে প্রকৃত জাতীয় উৎসব আয়োজনের দায় এড়ানোর কৌশল নয়..?
নটরাজ এন এ পলাশের মতে “নিবন্ধনকে উৎসব বলা শিল্পীদের সঙ্গে প্রতারণা”
বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প উন্নয়ন সোসাইটি–এর সভাপতি নটরাজ এন এ পলাশ আরও এক প্রতিক্রিয়ায় বলেন,
“যাত্রাশিল্প আমাদের লোকঐতিহ্যের এক শক্তিশালী ধারক ও বাহক। কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের মাঠপর্যায়ের সম্পৃক্ততা ছাড়া যদি নীতিনির্ধারণ করা হয়, তাহলে শিল্পের মূল সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে।”
তিনি আরও কঠোর ভাষায় বলেন,
“নিবন্ধন মানে নিজের অর্থে কাগজপত্র সম্পন্ন করা। আর জাতীয় উৎসব মানেই রাষ্ট্র শিল্পীদের সম্মানী দিয়ে মঞ্চ তৈরি করবে। এই দুই বিষয়কে এক করে দেখানো শিল্পীদের সঙ্গে সরাসরি প্রতারণার শামিল।
যদি ২০২৫’সালের নিবন্ধন কার্যক্রমকে ইচ্ছাকৃতভাবে ‘জাতীয় উৎসব’ হিসেবে প্রচার করা হয়ে থাকে, তাহলে তা প্রশাসনিক অনিয়মই নয়—দুর্নীতির আওতায় পড়ে কি না, সেটি সরকারের তদন্তসাপেক্ষ বিষয়।”
নটরাজ এন, এ পলাশের দাবি, ৪০ থেকে ৫০ বছর ধরে যাত্রায় অভিনয়, নির্দেশনা ও সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত প্রবীণ শিল্পীদের নীতিমালা প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত না করে একতরফা সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভবিষ্যতে শিল্পকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে।
এম আলম লাবলুর মন্তব্য: “কাগুজে প্রক্রিয়া দিয়ে শিল্প বাঁচে না”
অন্যদিকে বাংলাদেশ যাত্রাশিল্প মালিক সমিতি–এর সভাপতি এম আলম লাবলু আরও বলেন,
“যাত্রাশিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রথমে শিল্পীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। উৎসব আয়োজন সেই ক্ষেত্র তৈরি করে। কেবল প্রশাসনিক কাঠামো শক্তিশালী করলেই শিল্প বাঁচে না।”
তিনি আরও বলেন,
“নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সেখানে দলগুলো নিজেদের অর্থায়নে নিবন্ধিত হয়। কিন্তু জাতীয় যাত্রা উৎসব মানেই রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতায় শিল্পীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ। এই দুই বিষয়কে এক করে প্রচার করা হলে তা বিভ্রান্তিকর এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেই মনে হবে। আমরা স্পষ্ট করে বলতে চাই—নিবন্ধনকে উৎসব বলা হলে তা শিল্পীসমাজের অধিকার খর্ব করার শামিল।”
অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট মহলের অভিযোগ, নীতিমালা কমিটি গঠনের প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণমূলক আলোচনা, উন্মুক্ত মতামত গ্রহণ কিংবা প্রবীণ শিল্পীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার স্পষ্ট উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয়নি। বরং সীমিত পরিসরে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা ভবিষ্যতে যাত্রাশিল্পের সাংগঠনিক কাঠামোকে বিতর্কিত করতে পারে।
যাত্রাশিল্পীর মতে, নিবন্ধন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ না হলে এবং পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলো পুনর্মূল্যায়ন না করলে শিল্পে বিভাজন আরও বাড়বে।
তারা দাবি করছেন, ২০২৫’সালের নিবন্ধন কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাতিল রেখে একটি প্রতিনিধিত্বমূলক, গ্রহণযোগ্য ও আইনসম্মত কাঠামো তৈরি করা হোক—যেখানে প্রবীণ শিল্পী, সক্রিয় যাত্রাদল, প্রযোজক ও সাংগঠনিক নেতৃবৃন্দ সমানভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন।
যাত্রাশিল্প সংশ্লিষ্টদের মতে, জাতীয় যাত্রা উৎসব কেবল আনুষ্ঠানিক সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি শিল্পীদের আয়-রোজগারের সুযোগ সৃষ্টি করে, নতুন প্রজন্মকে আকৃষ্ট করে এবং লোকনাট্যভিত্তিক সংস্কৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে। সে কারণে পূর্বঘোষিত উৎসব বাস্তবায়নে গড়িমসি শিল্পীসমাজের কাছে হতাশাজনক বার্তা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকজন নেতা ইঙ্গিত দিয়েছেন, দাবিগুলো আমলে নেওয়া না হলে বৃহত্তর কর্মসূচির বিষয়ে আলোচনা হতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যাত্রাশিল্পের মতো ঐতিহ্যনির্ভর একটি ক্ষেত্রকে কেবল প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সমন্বিত সাংস্কৃতিক নীতির আওতায় আনতে হবে। নতুবা দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ শিল্পীদের আস্থা হারালে এর প্রভাব পুরো লোকনাট্য ধারার উপর পড়তে পারে।
শিল্পীসমাজের অভিমত—স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও অংশগ্রহণমূলক সিদ্ধান্তই পারে বর্তমান অচলাবস্থা নিরসন করতে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ শিল্পীদের এই ক্ষোভ ও উদ্বেগকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং ঘোষিত জাতীয় যাত্রা উৎসব বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে কিনা।
