
দেশে এমন অনেক আইন ও আদেশ রয়েছে, বাস্তবে যার কোনো প্রয়োগ নেই। ১৯৮৪ সালে জারি করা ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’ এমনই একটি বিস্মৃত আইন। সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত অপচয় রোধ এবং অতিথির সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করার এই আদেশটি সম্প্রতি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। গত ২২ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে বিএনপির সংসদ সদস্য শাহাদাত হোসেন সেলিম বিয়ে ও গায়েহলুদের অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত জাঁকজমক ও অপচয় রোধে অতীতে জারি করা এই ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আইন’ কঠোরভাবে কার্যকর করার আহ্বান জানান। এরপরই বিষয়টি নিয়ে সর্বমহলে শুরু হয়েছে নতুন গুঞ্জন।
কেন তৈরি হয়েছিল এই আইন?
ব্রিটিশ আমলের ধারাবাহিকতায় এবং ১৯৫৬ সালের ‘দ্য কন্ট্রোল অব এসেনশিয়াল কমোডিটিজ অ্যাক্ট’-এর ৩ (১) ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৮৪ সালের ৩ জুলাই বিশেষ এই আদেশটি জারি করে তৎকালীন খাদ্য মন্ত্রণালয়। মূলত দেশের সামগ্রিক খাদ্য পরিস্থিতি বিবেচনা এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের অপচয় রুখতেই ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ, ১৯৮৪’ (দ্য গেস্ট কন্ট্রোল অর্ডার, ১৯৮৪) কার্যকর করা হয়েছিল।
কী আছে ‘অতিথি নিয়ন্ত্রণ আদেশ’-এ?
১০০ জনের বেশি অতিথি নিষিদ্ধ: এই আদেশের মূল শর্ত ছিল—বিয়ে, জন্মদিন, আকিকা বা যেকোনো সামাজিক ও পারিবারিক অনুষ্ঠানে আয়োজক পরিবার বাদে সর্বোচ্চ ১০০ জনের বেশি অতিথিকে চাল বা গমের তৈরি কোনো খাবার পরিবেশন করা যাবে না।
অনুমতি ও বাড়তি ফি: বিশেষ কারণে যদি কোনো অনুষ্ঠানে ১০০ জনের বেশি অতিথি আপ্যায়ন করতেই হয়, তবে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসক (ডিসি) বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছ থেকে ‘ফরম-এ’-র মাধ্যমে পূর্ব অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। শুধু তাই নয়, ১০০ জনের অতিরিক্ত প্রতি অতিথির জন্য সরকারি কোষাগারে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে জনপ্রতি ২৫ টাকা (শুরুতে যা ছিল ১০ টাকা) ফি জমা দিতে হবে।
তদারকি ও তল্লাশির ক্ষমতা: নিয়ম ঠিকমতো মানা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করার জন্য খাদ্য অধিদপ্তরের পরিদর্শক, পুলিশের গেজেটেড কর্মকর্তা কিংবা ডিসি বা ইউএনও মনোনীত যেকোনো সরকারি কর্মকর্তাকে অনুষ্ঠানস্থলে প্রবেশ ও তল্লাশি করার আইনি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
শাস্তির বিধান
১৯৫৬ সালের মূল আইনের আওতায় এই আদেশ অমান্য করা একটি গুরুতর দণ্ডনীয় অপরাধ। নিয়ম ভাঙলে অনুষ্ঠানের মূল আয়োজক এবং যে স্থানে অনুষ্ঠানটি হচ্ছে (যেমন: কমিউনিটি সেন্টার বা কনভেনশন হল) তার মালিকের জরিমানা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
২০০৩ সালের সংশোধনী
বাস্তবতা বিবেচনা করে ২০০৩ সালে এই আদেশে একটি সংশোধনী আনা হয়। এর মাধ্যমে কিছু বিশুদ্ধ ধর্মীয় ও পারলৌকিক অনুষ্ঠানকে অতিথির বাধ্যবাধকতা বা অতিরিক্ত ফির আওতামুক্ত করা হয়। এই ছাড় পাওয়া অনুষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে:
১. মিলাদ মাহফিল ও ইফতার পার্টি
২. কুলখানি ও চেহলাম
৩. ওরস বা শ্রাদ্ধ
বর্তমান পরিস্থিতি: কেবলই কাগজের আইন
আইনটি আনুষ্ঠানিকভাবে কখনো বাতিল করা হয়নি, ফলে এটি এখনো দেশের বৈধ আইন হিসেবে টিকে আছে। তবে যথাযথ প্রয়োগ, নজরদারি এবং প্রশাসনিক উদাসীনতার কারণে বর্তমানে এটি প্রায় সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়। দেশের যেকোনো রেস্তোরাঁ, কমিউনিটি সেন্টার বা রাজকীয় কনভেনশন সেন্টারে প্রতিদিন হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে জাঁকজমকপূর্ণ অনুষ্ঠান হলেও, প্রশাসনের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া বা সরকারি কোষাগারে ফি দেওয়ার এই নিয়মটি এখন আর কোথাও চর্চা করা হয় না। ফলে কোটি টাকার অপচয় রোধে তৈরি হওয়া আইনটি এখন কেবলই কাগজের দলিলে বন্দি।
