
দেশের অন্যতম বৃহৎ জলাভূমি ও কৃষিভিত্তিক অঞ্চল চলনবিল। ঋতু বদলের সঙ্গে সঙ্গে এই অঞ্চলের মাঠে মাঠে বদলে যায় রঙ—কখনো সবুজ ধান, কখনো হলুদ সরিষা, আবার কখনো নানা জাতের সবজি। দূর থেকে দেখলে চলনবিল যেন এক অপরূপ প্রাকৃতিক ক্যানভাস। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে প্রতিদিনই চলছে কৃষকের কঠোর পরিশ্রম ও নিরব সংগ্রাম।
ভোরের আলো ফোটার আগেই মাঠে নামেন কৃষকরা। মাথায় কিংবা কাঁধে ফসলের বোঝা নিয়ে মাইলের পর মাইল হেঁটে বাজারের দিকে রওনা দেন তারা। যান্ত্রিক সুবিধার অভাব ও খরচের চাপে এখনো অনেক কৃষককে ভরসা করতে হয় নিজের শরীরের শক্তির ওপর। মাঠ থেকে ফসল কেটে আনা, বাছাই করা, বস্তাবন্দি করে বাজারে পৌঁছানো—প্রতিটি ধাপেই রয়েছে শ্রম ও সময়ের বড় বিনিয়োগ।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে সার, বীজ ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় অনেক বেশি। অন্যদিকে ফসল ঘরে তোলার সময় শ্রমিক সংকট দেখা দিলে খরচ আরও বেড়ে যায়। বাজারে গিয়ে অনেক সময় কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় থাকেন তারা। ফলে সারা বছরের পরিশ্রমের ফল অনেক কৃষকের কাছেই অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
একজন অভিজ্ঞ কৃষক জানান, “ফসল ফলাতে আমাদের কষ্টের শেষ নেই। কিন্তু বাজারে গেলে আড়তদারদের ওপর নির্ভর করতে হয়। ন্যায্য দাম না পেলে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়ে।” আবার কেউ কেউ বলেন, সংরক্ষণ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় অনেক সময় ফসল দ্রুত বিক্রি করতে বাধ্য হতে হয়, এতে দাম কমে যায়।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, চলনবিল অঞ্চলে আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি, সহজ শর্তে কৃষিঋণ, ফসল সংরক্ষণাগার ও সরাসরি বাজার ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে কৃষকের জীবনমান উন্নত হতে পারে। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতে সরকারি তদারকি জোরদার করারও দাবি উঠেছে।
চলনবিলের বিস্তীর্ণ মাঠে আজও কৃষকেরা ঘাম ঝরিয়ে যাচ্ছেন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে। প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে, সীমিত সম্পদের মধ্যেও তারা এগিয়ে চলেছেন—নীরবে, নিরলসভাবে। এই কৃষকদের শ্রম আর ত্যাগের ওপরই দাঁড়িয়ে আছে দেশের অর্থনীতি ও মানুষের খাদ্য জোগানের ভবিষ্যৎ।
