
স্কুলের প্রাচীন ঘন্টা ধ্বনি যখন বাতাসে মিশে যাচ্ছিল, অন্তরা তখন সিঁড়ির শেষ ধাপে দাঁড়িয়ে আকাশ দেখছিল। তার চোখ দুটো যেন বহু দূরে হারিয়ে যাওয়া কোনো স্মৃতিকে খুঁজছিল। এই স্কুলের প্রতি তার এক অন্যরকম টান, যেন প্রতিটি পাথরের ভাঁজে লুকিয়ে আছে তার জীবনের কোনো এক অধ্যায়। ঠিক তখনই তার পাশ দিয়ে মৃদু পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন কবির। তার চোখে ছিল এক গভীর চিন্তার ছাপ, যেন কোনো অদেখা পথের ঠিকানা খুঁজছিলেন তিনি। তাদের চোখাচোখি হলো এক মূহুর্তের জন্য। সেই এক মূহুর্তই যেন বদলে দিল দুজনের গল্পের মোড়।
অন্তরা ছিল শান্ত স্বভাবের, তার চোখে ছিল স্নিগ্ধতা আর মুখে মিষ্টি হাসি। অন্যদিকে কবির ছিলেন দৃঢ়চেতা এবং স্বপ্নচারী। প্রথম দেখায় দুজনের মধ্যে কোনো কথা হয়নি, কিন্তু তাদের অবচেতন মন একে অপরের প্রতি এক অদৃশ্য টানে বাঁধা পড়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে তাদের দেখা হওয়া শুরু হলো। কখনো স্কুলের চত্বরে, কখনো পাশের কোনো টি-স্টলে, কোন এক খাবার হোটেলে, আবার কখনো বইয়ের দোকানে। তাদের আলোচনা শুরু হলো সাহিত্য, জীবন দর্শন, এবং সবশেষে ব্যক্তিগত অনুভূতি নিয়ে।
কবির অন্তরা’কে দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন তার সরলতা আর গভীর চিন্তাভাবনার জন্য। অন্তরা আবার কবির এর আত্মবিশ্বাস আর তার স্বপ্ন দেখার ক্ষমতাকে পছন্দ করত। তাদের ভালোবাসার গল্পটা অনেকটা পুরোনো দিনের রূপকথার মতো ছিল, যেখানে কোনো নাটকীয়তা ছিল না, ছিল শুধু একে অপরের প্রতি সম্মান আর গভীর আস্থা।
কিন্তু জীবনের পথ সবসময় সরল থাকে না। এক সময় অন্তরা কে তার বাবার কর্মসূত্রে শহরের বাইরে যেতে হলো। কবির এর মন ভেঙে গেল। স্কুলের সিঁড়িতে বসে সে রোজ অন্তরা’র ফিরে আসার প্রার্থনা করত। সে জানত, তাদের ভালোবাসা সত্য, কিন্তু দূরত্ব কি সেই সত্যকে মুছে দেবে? অন্তরাও দূরে থেকেও কবির এর কথা ভুলতে পারছিল না। প্রতিটি কাজে, প্রতিটি চিন্তায় তার চোখগুলো কবির এর ছবি খুঁজত। তারা চিঠি লেখা শুরু করল। প্রতিটা চিঠিতে তাদের একে অপরের প্রতি ভালোবাসা আরও গভীর হয়ে উঠত।
অনেক বছর পর অন্তরা যখন ফিরে এলেন, সেদিন কবির স্কুলের গেটে দাঁড়িয়েছিল। অন্তরা কে দেখেই তার চোখগুলো জলে ভরে উঠল। তারা দুজন একে অপরের দিকে এগিয়ে এলো। সেদিন স্কুলে একটি কনসার্ট অনুষ্ঠান শুরু হয়েছিল, আর সেই কনসার্টের আলোয় তাদের মিলন যেন এক নতুন গল্পের সূচনা করল।
তাদের ভালোবাসার গল্প শুধু দুটি মানুষের গল্প ছিল না, ছিল বিশ্বাস, ধৈর্য আর একে অপরের প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তারা প্রমাণ করেছিল, সত্যিকারের ভালোবাসা কোনো দূরত্ব মানে না, কোনো বাধাকে পরোয়া করে না। সময়ের প্রতিটি পাতায় তাদের গল্প অন্তরা কবির ভালবাসায় স্মৃতির আলপনা হয়ে অমর হয়ে রইল, যা লেখক হুমায়ুন কবির এর জীবনে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছিল।
✍️অন্তরা কবির..
