
মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার নামে পরিচালিত একটি কথিত সংগঠনকে ঘিরে সংঘবদ্ধ প্রতারণার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে সংগঠনটির চেয়ারম্যান নুরুল্লাহ আল আমিনের বিরুদ্ধে। “আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও বাস্তবায়ন প্রশিক্ষণ হিট ফাউন্ডেশন” নাম ব্যবহার করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে কৌশলে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে একাধিক ভুক্তভোগী অভিযোগ করেছেন।
প্রতারণার কৌশল: পদ-পদবী, চাকরি ও পরিচয়পত্রের প্রলোভন
অভিযোগ অনুযায়ী, নুরুল্লাহ আল আমিন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষ করে হোয়াটসঅ্যাপ—ব্যবহার করে বিভিন্ন গ্রুপ খুলে সদস্য সংগ্রহ করতেন। সেখানে আকর্ষণীয় পদ-পদবী, চাকরির প্রতিশ্রুতি এবং তথাকথিত মানবাধিকার পরিচয়পত্র (কার্ড) দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করা হতো।
পরবর্তীতে এসব কার্ড প্রদানের নামে ৫০০ থেকে ১৫০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হতো। ভুক্তভোগীদের দাবি, এটি একটি সুসংগঠিত প্রতারণা চক্র, যেখানে পরিকল্পিতভাবে মানুষকে টার্গেট করে অর্থ সংগ্রহ করা হয়েছে। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া বা ব্লক করা হতো এবং নতুন গ্রুপ খুলে একই কার্যক্রম পুনরায় চালানো হতো।
প্রতারণার ধাপভিত্তিক কৌশল
ভুক্তভোগীদের তথ্য অনুযায়ী প্রতারণাটি একটি পরিকল্পিত কাঠামোর মাধ্যমে পরিচালিত হয়েছে—
১. প্রথমে “টিম লিডার” তৈরি করা হয়
২. তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন সদস্য সংগ্রহে ব্যবহার করা হয়
৩. ৫০ টাকার প্লাস্টিক কার্ড ১০০০–১৫০০ টাকায় বিক্রি
৪. অফিস খোলার নামে চাঁদা আদায়
৫. ১০০ টাকার গেঞ্জি ৫০০ টাকায় বিক্রি
৬. অফিস ফার্নিচার কেনার নামে অর্থ সংগ্রহ
৭. কর্পোরেট সিম দেওয়ার নামে টাকা নেওয়া
৮. অফিস ভাড়া দিতে ব্যর্থ হয়ে সম্পদ বিক্রি ও আত্মগোপন
৯. সংগৃহীত অর্থ আত্মসাৎ করে ব্যক্তিগত ঋণ পরিশোধের অভিযোগ
ভুয়া ভাবমূর্তি তৈরির অভিযোগ
তদন্তে উঠে এসেছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি নিজের ফেসবুক আইডিতে বিভিন্ন মানবিক কার্যক্রম ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের কাজ শেয়ার করে নিজেকে সমাজসেবক হিসেবে উপস্থাপন করতেন। একইসাথে “মানবিক প্রোগ্রাম” ও “সংগঠনের কার্যক্রম” এর নামে অর্থ সংগ্রহের অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীদের নির্দিষ্ট অভিযোগ
পিন্টু আহমেদ (পুরান ঢাকা): পদ দেওয়ার নামে ২,৯০০ টাকা নেওয়া হয়; পরে গ্রুপ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়
মোঃ জাহিদুল ইসলাম (ইঞ্জিনিয়ার): সংগৃহীত অর্থ চেয়ারম্যানের কাছে পৌঁছে দেন; পরে প্রতিবাদ করায় বাদ দেওয়া হয়
হাবিবুর রহমান (সিলেট): সদস্যপদ ও কমিটির নামে লক্ষ লক্ষ টাকা সংগ্রহ; ব্যক্তিগতভাবে ৫৩,০০০ টাকা ক্ষতিগ্রস্ত
এনামুল হক চৌধুরী: শুধু সিলেট অঞ্চল থেকেই প্রায় দেড় লক্ষ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
রহমত আলী গাজী: গেঞ্জি সরবরাহের নামে ৩০,০০০ টাকা আত্মসাৎ
সোহাগ (মুগদা-মান্ডা): কার্ড তৈরির নামে প্রায় ৬০,০০০ টাকা নেওয়া
অফিস কর্মী: টানা তিন মাসের বেতন না পেয়ে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন
আব্দুর রব: চাকরি দেওয়ার নামে প্রায় ১ লক্ষ টাকা নেওয়া হয়; দীর্ঘ চেষ্টার পর মাত্র ৫০ হাজার টাকা ফেরত পান, বর্তমানে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন
আজিম মিয়া (ঢাকা): সাংগঠনিক পদ দেওয়ার পর অনৈতিক আচরণের প্রতিবাদ করায় অপসারণ
সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব
সংগঠনের মহাসচিব ইব্রাহিম খান বলেন—
“চেয়ারম্যানকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও তিনি কারও কথা শোনেননি। তার সঙ্গে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কাজ করছে, যারা অর্থ সংগ্রহের সঙ্গে সরাসরি জড়িত।”
অভিযুক্তের প্রতিক্রিয়া
নুরুল্লাহ আল আমিন অভিযোগ অস্বীকার করে কিছু ব্যক্তির বিরুদ্ধে কার্ড বাণিজ্যের দায় চাপানোর চেষ্টা করেছেন। তবে নিজের সম্পৃক্ততা বিষয়ে তিনি কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
অফিস স্থাপন ও আত্মগোপনের অভিযোগ
বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরির জন্য অল্প সময়ের জন্য একটি অফিস ভাড়া নেওয়া হয় এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে অফিস ত্যাগ করে অভিযুক্ত পিরোজপুরে নিজ গ্রামের বাড়িতে আত্মগোপনে চলে যান বলে অভিযোগ রয়েছে।
দেশব্যাপী ভুক্তভোগী ও গণমাধ্যমে উদ্যোগ
“সত্য ও ন্যায়ের পথে চলবো” নামে একটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে প্রায় ৫০০ ভুক্তভোগী একত্রিত হয়ে অভিযোগ তুলে ধরেছেন এবং বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন।
আইনকে চ্যালেঞ্জ করার অভিযোগ
ভুক্তভোগীদের দাবি, টাকা ফেরতের অনুরোধ উপেক্ষা করে অভিযুক্ত উল্টো ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। এমনকি তিনি দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব নয়।
নতুন কৌশলে প্রতারণার আশঙ্কা
পূর্বে গঠিত ৩১ সদস্যের কমিটি বিলুপ্ত করে “টপ টেন” নামে নতুন কমিটি গঠন করে পুনরায় কার্যক্রম চালুর চেষ্টা চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগীদের মতে, এটি প্রতারণার নতুন ধাপ।
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা
ক্ষুব্ধ ভুক্তভোগীরা সংগঠনের নিবন্ধন বাতিল, আর্থিক লেনদেনের সুষ্ঠু তদন্ত এবং দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। তাদের ভাষ্য—এটি একটি সংঘবদ্ধ প্রতারণা চক্র, যা দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের সরলতাকে পুঁজি করে অর্থ আত্মসাৎ করে আসছে।
তথ্যসূত্র: মোহাম্মদ আজিম মিঞা
