
রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় এতিম শিশু ও ওলামা-মাশায়েখদের সম্মানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান আয়োজিত ইফতার মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। উপস্থিত সকলের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতি অনুযায়ী অতীতের প্রতিটি রামাদানের প্রায় প্রতিদিনই আমরা বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষের জন্য ইফতারের আয়োজন করে আসছিলাম।

আলেম, ওলামা-মাশায়েখ এবং ইয়াতিমদের সম্মানে আমরা সাধারণত পবিত্র রামাদানের প্রথম দিনেই ইফতার মাহফিলের আয়োজন করে থাকি। তবে দেশের চলমান বাস্তবতায় এবার আমাদেরকে একটু দেরি করেই আপনাদের সঙ্গে ইফতারের আয়োজন করতে হয়েছে। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে গ্যাস, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ব্যয় সংকোচন এবং কৃচ্ছতা সাধনের অংশ হিসেবে এবারের রামাদানে আজ এবং গতকালের ইফতার মাহফিলসহ মোট দুইটি ইফতার মাহফিলের আয়োজন করেছি।
বৈশ্বিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এবারের রামাদানে এটিই হয়তো শেষ ইফতার মাহফিল। আজকের এই ইফতার মাহফিলের অংশগ্রহণকারী ‘ইয়াতিম সন্তানরা’ আজকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অতিথি। পবিত্র কোরআন এবং হাদিসে ‘ইয়াতিমের হক’ আদায়ের ব্যাপারে মুমিন মুসলমানদের প্রতি ইসলামের কঠোর নির্দেশনা রয়েছে।
ইয়াতিমের প্রতি ‘হক আদায়ে’ গুরুত্ব এবং ইয়াতিমদের জন্য আজকের এই ইফতার মাহফিলের আয়োজন বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
-
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকের এই ইফতার মাহফিলে সঙ্গত কারণে সকল ইয়াতিম সন্তানদের আমন্ত্রণ জানানো সম্ভব হয়নি।
তবে ইয়াতিমদের প্রতি রাষ্ট্র ও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরার ক্ষেত্রে এই ইফতার মাহফিলের অবশ্যই প্রতীকী তাৎপর্য রয়েছে।
এই ইফতার মাহফিল ইয়াতিমদের প্রতি বিত্তবানদের দৃষ্টিভঙ্গি এবং দায়-দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে একটি ইতিবাচক বার্তা দেবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
প্রত্যেক বিত্তবান যদি অসহায় ইয়াতিমদের প্রতি পবিত্র কোরআন-হাদিসের নির্দেশনা অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করতে সচেষ্ট থাকেন, তাহলে আমি বিশ্বাস করি পিতৃহারা এতিম সন্তানেরা এক বুক বেদনা নিয়েও রাষ্ট্র ও সমাজে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা খুঁজে পাবে।
নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম না বাড়াতে ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, পবিত্র রামাদান ত্যাগ ও সংযমের মাস। রহমত, বারকাত ও সংযমের মাস। অথচ, অপ্রিয় হলেও সত্য, রামাদান আসলেই কেউ কেউ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়িয়ে দেন।
রামাদান মাসকে লোভ-লাভের মাস বানিয়ে ফেলবেন না।
পবিত্র রামাদান মাসেও যারা অসাধু পন্থা অবলম্বন করছেন, আপনাদের প্রতি আমার বিনীত আহবান – অনুগ্রহ করে মানুষের কষ্টের কারণ হবেন না।
পরিকল্পিত যাকাত ব্যবস্থাপনায় দারিদ্র বিমোচনে ভূমিকা রাখা সম্ভব উল্লেখ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামের পাঁচটি ভিত্তির আরেকটি হলো যাকাত।
দেশে যাকাত ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমি একটি পরিকল্পনার কথা আপনাদের সঙ্গে শেয়ার করতে চাই।
ইসলামের বিধান অনুযায়ী অনেক বিত্তবান নিজ উদ্যোগে যাকাত প্রদান করেন। কেউ কেউ সরকারের ‘যাকাত বোর্ড’-এর মাধ্যমেও যাকাত পরিশোধ করে থাকেন।
বিভিন্ন গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে, প্রতি বছর বাংলাদেশে যাকাতের পরিমাণ ২০–২৫ হাজার কোটি টাকার বেশি হয়ে থাকে। কেউ কেউ এর পরিমাণ আরও অনেক বেশি বলেছেন। তবে সুপরিকল্পিত ও সুসংগঠিতভাবে যাকাত বন্টন না হওয়ায়, বিত্তবান ব্যক্তির যাকাত আদায় হয়ে গেলেও এর অর্থ দারিদ্র বিমোচনে কতটা কার্যকর হচ্ছে, তা একটি বড় প্রশ্ন।
যতদূর জানি, ইসলামী বিধান যাকাত দাতাদের এমনভাবে উৎসাহিত করে, যাতে একজন যাকাত গ্রহীতা প্রথম বছর যাকাত গ্রহণের পর পরের বছর আর যাকাত গ্রহণ করতে না হয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পিতভাবে যাকাত বন্টন করা গেলে দারিদ্র বিমোচনে এটি যুগান্তকারী ভূমিকা পালন করতে পারে।
এমন বাস্তবতায় সরকার যাকাত ব্যবস্থাপনাকে আরো কার্যকর এবং লক্ষ্যভিত্তিক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।
দেশে ধনী-দরিদ্র সব মিলিয়ে বর্তমানে পরিবারের সংখ্যা কমবেশি চার কোটি। এসব পরিবারের মধ্যে দরিদ্র কিংবা হতদরিদ্র পরিবারগুলোকে চিহ্নিত করে, প্রতিবছর পর্যায়ক্রমে ৫ লক্ষ পরিবারকে এক লক্ষ করে টাকা করে যাকাত দেওয়া যায়।
আমার বিশ্বাস, এসব পরিবারের মধ্যে বেশিরভাগ পরিবারকে পরের বছর আর যাকাত দিতে নাও হতে পারে।
লক্ষ্যভিত্তিক ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার মাধ্যমে যাকাত প্রদান করলে ১০–১৫ বছরের মধ্যে শুধুমাত্র যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দেশে দারিদ্র বিমোচনে কার্যকর ভূমিকা রাখা সম্ভব।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সম্মানিত ওলামা-মাশায়েখবৃন্দের উদ্দেশে বলেন, দারিদ্র বিমোচনে যাকাত ব্যবস্থাপনার বিষয়টি যৌক্তিক মনে হলে, বিত্তবানদের সচেতন করার ক্ষেত্রে আপনাদের সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখতে হবে।
যাকাত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দারিদ্র বিমোচনের লক্ষ্যে দেশের শীর্ষস্থানীয় আলেম, ইসলামিক স্কলার এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্টদের নিয়ে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিদ্যমান ‘যাকাত বোর্ড’ পুনর্গঠন করা সম্ভব।
‘যাকাত’কে দারিদ্র বিমোচনে ব্যবহার করে বাংলাদেশকে ইসলামী বিশ্বে একটি মডেল হিসেবে উপস্থাপন করার সুযোগ রয়েছে। দেশ ও জনগণের কল্যাণে নেওয়া প্রতিটি কর্মসূচি যেন সরকার সুন্দরভাবে বাস্তবায়ন করতে পারে, মহান আল্লাহর দরবারে এই দোয়া করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বক্তব্য শেষ করেন।
ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন ধর্মমন্ত্রী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ, সমাজকল্যাণ বিষয়ক মন্ত্রী প্রফেসর ড. এজেডএম জাহিদ হোসেন, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী মীর শাহ আলম, আসসুন্নাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান শায়খ আহমেদুল্লাহ, জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকসহ প্রমুখ।
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা বিষয়ক উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এ কে এম শামছুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ছালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন ইফতার মাহফিলে উপস্থিত ছিলেন।
