
রাজধানীর তুরাগে আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে সংঘটিত নৃশংস হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন তথ্য সামনে আসছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এটি কোনো আকস্মিক মব জাস্টিস বা সাধারণ রাজনৈতিক সংঘর্ষ ছিল না; বরং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার উদ্দেশ্যে পরিচালিত একটি সুপরিকল্পিত ‘কিলিং মিশন’।
গোয়েন্দা ও পুলিশ প্রশাসনের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে বলে দাবি করা হচ্ছে, নিখোঁজ সাত নেতাকর্মীকে সম্পূর্ণ গুম ও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী ও বিএনপি নেতা এস এম জাহাঙ্গীর।
এদিকে, তুরাগ নদী থেকে ইতোমধ্যে চারজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। বাকি তিনজনের সন্ধানে তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত-সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মাস্টারমাইন্ড’ হিসেবে এস এম জাহাঙ্গীরের নাম উঠে এসেছে।
প্রাথমিক তদন্তে প্রশাসনের দাবি, তুরাগ এলাকায় রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তার এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই সাত নেতাকর্মীকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
উদ্ধার হওয়া চারটি মরদেহের ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, তাদের ওপর নির্মম নির্যাতন চালিয়ে হত্যার পর মরদেহ নদীতে ফেলে দেওয়া হয়।
পুলিশ আরও খতিয়ে দেখছে, তুরাগ থানা বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতাকর্মী এবং আরও কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ও অর্থদাতার সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না।
এদিকে, ছাত্রলীগ নেতা আরিফুল ও যুবলীগ নেতা বিপ্লবের পর আরও দুজনের মরদেহ উদ্ধার হওয়ায় তুরাগ নদীর তীরে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ।
ডিএমপির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, গত ২২ জুনের হামলার পর থেকেই গোয়েন্দা পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান ও ঘটনার প্রকৃতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করে। অনুসন্ধানে জানা যায় বলে দাবি করা হচ্ছে, হামলার পর এস এম জাহাঙ্গীরের সরাসরি নির্দেশ ও উপস্থিতিতেই আওয়ামী লীগের সাত নেতাকর্মীকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়।
গোয়েন্দা তথ্য ও স্থানীয় সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে তুরাগ এলাকায় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করে দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করতেই জাহাঙ্গীর তার অনুসারীদের নির্দেশ দেন, যাতে মিছিলে অংশ নেওয়া টার্গেটেড ব্যক্তিদের কাউকেই জীবিত রাখা না হয়।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, এই ‘কিলিং মিশন’ বাস্তবায়নে স্থানীয় বিএনপি নেতা আবুল মাতবর, খোকা ভুঁইয়া, রাশেদ খান সুজন, মামুন পারভেজ তন্ময় ও জাকির হোসেন অর্নবসহ আট সদস্যের একটি বিশেষ স্কোয়াড সরাসরি অংশ নেয়। এছাড়া ২৩ জুন একই বাহিনী ছাত্রলীগ কর্মী রাব্বি হাজারীর ওপর হামলা চালিয়ে গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তুরাগ থানা পুলিশ ও ডিএমপি সূত্র জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর সুরতহাল ও ময়নাতদন্তের কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করা হচ্ছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, “এটি কোনো সাধারণ রাজনৈতিক রেষারেষি নয়; এটি একটি পরিকল্পিত ও ঠান্ডা মাথার হত্যাকাণ্ড। অপরাধী রাজনৈতিকভাবে যত বড়ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”
বর্তমানে এস এম জাহাঙ্গীরসহ এজাহারভুক্ত সকল আসামিকে গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে তুরাগ ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের একাধিক দল চিরুনি অভিযান পরিচালনা করছে। ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত অনেক নেতাকর্মী এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে জানা গেছে।
তবে এ বিষয়ে এস এম জাহাঙ্গীর বা অভিযুক্ত অন্যদের কোনো বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।
